বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু নামে শুধুই গণতন্ত্র। আমার বিশ্লেষণ মতে, একটা দেশ গনতান্ত্রিক হওয়ার পূর্বশর্ত হলো সবার মাঝে প্রকৃত শিক্ষা বিদ্যমান হওয়া, যাতে জনগন কারো কথায় নয় বরং নিজেরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারে ওইটার প্রয়োগ করতে পারে। সমস্যাটি হলো, এই জায়গায় নিজেরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা ও সে অনুযায়ী কাজ করতে পারেনা।
বর্তমানে আমাদের দেশের প্রত্যেকটা আনাচে কানাচে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের দাপট দেখা যায়, যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও অলিগলিতে তাদের রাজত্ব দেখা দেয়। আর এই রাজত্বের কারণে সাধারণ মানুষ চোখ তুলে তাকায় না, বরং দেখা যায় অবৈধ হলেও যার ধন সম্পদ বেশি তাদের কথা-কাজকে মানুষ শ্রদ্ধা করে, তাদের অনুসরণ করে, সাপোর্ট করে। যার ফলে ওই প্রভাবশালীদের সুবিধামতো ও ইচ্ছেমতো অনেক সিদ্ধান্ত পরিচালিত হয়। তাদের সুবিধামতে হওয়ায় তারাই লাভবান হয় কিন্তু সমাজ, জনগণ বরাবরের মতোই অবহেলার কাতারে রয়ে যায়। যার কারণে এ বিষয়ের সংস্কার আমার কাছে সর্বপ্রথম জরুরী বলে মনে হয়।
আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন হয়েগেছে যারা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন বা যারা প্রভাবশালী তারাই মনে করেন সকল ক্ষমতার মালিক হয়ে গেছেন যার কারণে প্রশাসন সহ সরকারি সব কন্ট্রল তাদের কাছে থাকে আর প্রশাসনও তাই মনে করে। ফলস্বরূপ প্রশাসন তাদেরকে গুরুত্ব দেয় ও বিভিন্ন বিষয়ে ছাড় দেয় পাশাপাশি টাকার ছড়াছড়িতো আছেই। প্রশাসনের লোকজন গুরুত্ব দেয় ভয়ে যাতে কেউ তাদের চাকুরী থেকে বের করে না দিতে পারে বা কোন ক্ষতি করতে না পারে।
কাজেই আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হবে প্রশাসনকে তাদের ক্ষমতা দেওয়া যে ক্ষমতার উপর কোন প্রভাবশালী কোন কথা বলতে পারবেনা। যদি কোন স্থানীয় প্রভাবশালী ও প্রশাসনের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা শুরু থেকেই নিতে হবে।
দ্বিতিয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরকার, রাজনীতি সব থেকে আলাদা করতে হবে ও তৎপরতা বাড়াতে হবে। যাতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী সেনা ও সকল বাহীনি প্রধান থেকে ধরে সাধারণ মানুষ কারো কোন বিষয়ে তদন্তে ও শাস্তিতে তাদেরকে কোন বাধার সম্মুখীন হতে না হয়, কোন ভয় যাতে তাদের আটকাতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা তারা পায়।
তাদের কাজ থাকবে প্রশাসনকে কন্ট্রোল করা। প্রশাসন কোথায় কাকে সুযোগ দিচ্ছে তা পর্যালোচনা করা। দেশের যত রাজনীতিবিদ , প্রভাবশালী আছে টাদের আর্থিক, সামাজিক সর্বোপরি গতিবিধি পর্যালোচনা করা।
৫ ই আগস্টের পর এখন পর্যন্ত এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যাতে একটা নতুন বাংলাদেশ তৈরি করা যায়। কারণ সব প্রশাসনিক কর্মকান্ড এখনও তাদের নিজেদের কথায় চলেনা, কিছু রাজনৈতিক সংগঠন ও এলাকার রাজনৈতিক – প্রভাবশালীদের কথায়ই পরিচালিত হয়।
এখন প্রশাসন যদি এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হয় তাহলে দেখেন সাধারণ জনগন প্রত্যেক এলাকার প্রভাবশালীদের উপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেলবে মনে করবে তাদের হাতে কোন ক্ষমতা নাই যার কারণে কোন একটা ইস্যুতে তারা গলা উচু করে কথা বলতে পারবে।
একটা উদাহরণ দেই। মনে করেন আমি একজন সাধারন জনগন প্লাস এখন জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির অন্যতম নেতা নাহিদ ভাই, আসিফ ভাই, হাসনাত ভাই, সারজিস ভাই, তারপর বিএনপির মির্জা ফখরুল, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইত্যাদি তাদের মধ্যে একজন একটা কাজে সরকারি কোন দপ্তরে গেলাম। মনে করেন শাহবাগ থানায় কোন একটা কাজে গেলাম। আমি অনেক আগ থেকে থানায় বসে আছি হঠাট নাহিদ ভাই আসলেন সাথে ১০-১২ জন উনার সহযোগী। নরমালি থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ এসে নাহিদ ভাইকে এসে স্বাগতম করবেন, চেয়ারে বসাবেন, উনার সাথের সবাইকে চা পান করাবেন, কী সমস্যা জিজ্ঞাসা করে দ্রুত সমাধান করে দেবন। কিন্তু আমি বসে আছি আমার কোন খেয়াল করবেন্না। কাজেই এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হতে হবে। আলগা পিরিত যেটা বলে সেটাকে না বলতে হবে। এ অবস্থায় থানার সবাই নরমাল থাকবে সবার সাথে মিষ্টি ভাষায় না, যেটা প্রশাসনিক ভাষা সেটাই ব্যবহার করতে হবে।
বর্তমানে যারা দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বা লিডারশিপে আছে তাদের দিয়েই উদাহরণ দিচ্ছি কারণ যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের কারণেই কিন্তু অনেক সময় সংস্কৃতি ঠিক হয়না।
আরেকটা উদাহরণ দেই। কয়েকদিন আগে হাসনাত ভাই গাজিপুরে গাড়িতে আক্রমণের স্বীকার হয়েছিলেন এবং প্রশাসন কয়েক ঘন্টার ভিতরই যারা আক্রমণ করেছিলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলো। আমি যদি এ জায়গায় আক্রমণের স্বীকার হইতাম প্রশাসন কী আমাকে এত গুরুত্ব সহকারে দেখতো?
যখন কোন দল ক্ষমতায় আসে তখন দেখা যায় তাদের ইচ্ছেমতো প্রশাসন চলে তারা যেটা হ্যা বলে প্রশাসন সেটা করে তারা যেটা না বলে প্রশাসনও না করে। তারা বলে যদি উনাকে গ্রেফতার করেন উনাকে গ্রেফতার করে আর প্রশাসন জবাবদিহীতার জন্য কিছু ফর্মালিটি মেন্টেইন করে।
বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সবাই যেমন একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনকে অত্যাধিক গুরু্ত্ব দেয় ও দাবি করে তেমনি একটা সুন্দর দেশ গঠনের জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসন হওয়া জরুরী। সেটার গুরুত্ব বরং আরো বেশি।
এমন প্রশাসন নীতি যদি গঠন করা যায় যে কাউকে ভয় পাওয়ার, আলগা পিরিত করার প্রয়োজনই তার পড়বেনা বরং ক্ষমতাশীলরা ঠিকঠাকমতো সব পরিচালনা করতে পারবে কী না তা নিয়ে ভয়ে থাকবে তাহলেই রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব।
আপনারা বলবেন গনতান্ত্রিক দেশ , জনগণকে জবাবদিহী করলেইতো হবে। আমি বলবো না, কারণ অই যে প্রথমে বলেছিলাম গণতন্ত্রে পূর্বশর্ত হলো প্রকৃত শিক্ষা। টাকার বিনিময়ে বা আমার প্রভাবশালীতার জন্য যদি জনগণ আমার ভক্ত হয় তাহলে জনগণ আমাকে ঠিকই বলবে, বিচার করবে না, ভাববেনা।